ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার পর মরদেহে আগুন দেওয়ার ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি দেখতে চায় পরিবার।
সরকারের পক্ষ থেকে দীপু দাসের পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে এক প্রতিক্রিয়ায় বুধবার দীপুর বাবা রবি চন্দ্র দাস বলেন, “৫০ লাখ টাকা কেন, সারা দুনিয়ার টাকা এনে দিলেও আমার ছেলের অভাব পূরণ হবে না।
“ছেলের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখে যেতে চাই। হত্যাকারীদের শাস্তি দেখে, এমন ঘটনা যেন আর কেউ ঘটানোর সাহস না পায়। আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন খালি না হয়।”
১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার স্কয়ার মাস্টারবাড়ি এলাকায় দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনা সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে।
এরপর ২৩ ডিসেম্বর শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা উপজেলার বানিহালা ইউনিয়নের মোকামিয়াকান্দা গ্রামে নিহত দীপু দাসের বাড়ি পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি পরিবারের প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে সহমর্মিতা জানান।
মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে সরকার জানায়, দীপুর পরিবারকে আর্থিক সহায়তার লক্ষ্যে বাড়ি নির্মাণের জন্য ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে, যা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন করবে। পাশাপাশি নগদ আর্থিক সহায়তা হিসেবে দীপু দাসের বাবা ও স্ত্রীকে ১০ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে এবং তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য ৫ লাখ টাকার একটি এফডিআর করা হবে।
মোবাইলের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তার বিষয়টি জানতে পেরেছেন জানিয়ে দীপুর বাবা রবি চন্দ্র দাস বলেন, “পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিল দিপু। তাকে এভাবে মারা হবে কোনোদিন ভাবতেও পারিনি। আমার ছেলের কী দোষ ছিল? ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করলে দেশে তো আইন ছিল। সেই আইনে বিচার হত। আমরা গরিব, তাই ছেলের জীবন রক্ষা করতে পারিনি।”
তিনি বলেন, “ছেলেকে এভাবে হত্যার পর থেকে দীপুর মা ও স্ত্রী একেবারে ভেঙে পড়েছে। তারা দুজনই খুব অসুস্থ। সারাদিন দুজনই কান্নাকাটি করে। তারা কেউ ঘুমাতে পারে না। তাদের নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়। এরপর তারা ঘুমায়। আবার দুই-তিন ঘণ্টা পর জেগে ওঠে। এভাবে চলছে আমাদের সংসার।”
দীপুর স্ত্রী অথবা মায়ের সঙ্গে কথা বলা যাবে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আধা ঘণ্টা আগে তাদের দুজনকেই ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। এখন তাদের সঙ্গে কথা বলা কোনো ভাবেই সম্ভব না। ঘুম থেকে জেগে উঠলে কথা বলানো সম্ভব হবে।”
আর্থিক সহায়তার বিষয়ে সংবাদ মাধ্যমে শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার বলেন, এ সহায়তা তারাকান্দার ইউএনওর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হবে।
তিনি বলেন, “দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড একটি নৃশংস অপরাধ, যার কোনো অজুহাত নেই এবং আমাদের সমাজে এর কোনো স্থান নেই। তার পরিবারেরকে সহায়তার যে প্রচেষ্টা সরকার করেছে তা একটি জীবনের তুলনায় কিছুই নয়। রাষ্ট্র নিশ্চয়ই সুবিচার নিশ্চিত করবে।
“সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ছড়িয়ে যেভাবে দীপু দাসকে হত্যা করা হয়েছে, তা পুরো জাতির জন্য লজ্জার। ন্যায়বিচারই কেবল এই লজ্জা থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পারে।”
তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, “মঙ্গলবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে ফোন করে দীপু চন্দ্র দাসের পরিবারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, জাতীয় পরিচয়সহ যাবতীয় কাগজপত্র নিয়েছে। তবে, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে আমাকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। জানালে অবশ্যই জানাব।”
ময়মনসিংহ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “দীপু দাস হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও সন্দেহভাজন আসামি আছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দীপুর ছোট ভাই অপু দাস ১৯ ডিসেম্বর বাদী হয়ে অজ্ঞাত ১৫০ জনকে আসামি করে ভালুকা থানায় মামলা করেন।
দীপু দুই বছর ধরে ভালুকার জামিরদিয়া পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কোম্পানিতে কাজ করছিলেন।






























